অভাবের তাড়নায়, হাওড়ায় আত্মঘাতী পরিযায়ী শ্রমিক

খড়গপুর ২৪×৭ ডিজিটাল: অভাবের তাড়নায় বিধ্বস্ত এক কাজ হারানো পরিযায়ী শ্রমিক আত্মঘাতী হয়েছেন। ঘটনাটি ঘটেছে হাওড়ায়।

কোভিড পরিস্থিতিতে ভিন রাজ্য থেকে কাজ হারিয়ে ফিরতে হয়েছে অনেককে। সেই শ্রমিকদের রাজ্যে কর্মসংস্থানের কথা দিয়েছিল তৃণমূল সরকার। কিন্তু কাজের কোনও বন্দোবস্ত করা হয়নি সরকারের তরফে। অন্যদিকে লকডাউন, রাজ্য সরকারের অবহেলায় কাজের সুযোগ ক্রমাগত কমছে।

 

তার উপর আছে জিনিসের দাম বেড়ে চলা। গরিব, মধ্যবিত্ত পরিবারের উপর সেই পরিস্থিতির প্রভাব মারাত্মক হয়ে উঠছে। অভাবে, উপার্জনের কোনও পথ না পাওয়ায় আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে।

 

গত ১ জুন থেকে কলকাতা সহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ৬ জন শ্রমজীবী অভাবের কারণে আত্মঘাতী হয়েছেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। এ ছাড়াও আরও কিছু আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে আশঙ্কা অনেকের। কিন্তু সেগুলির ক্ষেত্রে পুলিশ ‘পারিবারিক গোলমাল’-এর মতো অন্য কারণ দেখিয়েছে বলেই অভিযোগ। ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে অন্তত ৬ জন শ্রমিকের অসুস্থ হয়ে মৃত্যু হয়েছে।

 

শনিবার পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, হাওড়ায় মৃত যুবকের নাম রাজেশ গাঙ্গুলি (৩৪)। শুক্রবার দুপুরে হাওড়া বঙ্কিম সেতুর উপর থেকে নিচে হাওড়া স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন রেললাইনে ঝাঁপ দেন তিনি। রেল পুলিশ দেহ উদ্ধার করে। হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। মৃতের পকেটে আধার কার্ড ছিল। তা থেকে তাঁর পরিচয় জানা যায়। মৃত ব্যক্তি নারনা পঞ্চায়েতের দফরপুর মনসাতলার বাসিন্দা।

প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, রাজেশ এখানে কোনও কাজ না পেয়ে জুয়েলারির কাজ করতে বিভিন্ন সময়ে মুম্বাই ও গুয়াহাটিতে গিয়েছিলেন। প্রথম লকডাউনের সময়ে কাজ হারিয়ে বাড়িতে চলে আসেন। এখানে কোনোক্রমে সামান্য রোজগার করে সংসার চালাতেন। বাড়িতে মা আর তিনিই থাকতেন। অভাবের কারণে পারিবারিক অশান্তি দেখা দেয়। তাঁর স্ত্রী নিজের বাবার বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। অভাবের জীবনে প্রতিদিন দুই জনের খাবার জোগাড় করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে রাজেশের পক্ষে।

করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতেই রাজেশ জুয়েলারির কাজ করতে চলে যান মুম্বাইয়ে। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে কাজ হারিয়ে ফের বেকার হয়ে পড়েন তিনি। ফিরে আসেন ঘরে। তবে এখানে কোনও কাজ না পেয়ে প্রায় দুই মাস বেকার হয়ে ছিলেন। সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব পড়ে তাঁর পক্ষে।

তাঁর মা অপরের বাড়িতে কাজ করে কোনোরকমে দুই জনের খাবারের ব্যবস্থা করেন। কাজ হারিয়ে ঘরে ফিরে এখানে কোনও কাজ না পাওয়ায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যান রাজেশ। এদিন তাঁর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরে মা কান্নায় ভেঙে পড়েন। এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

 

প্রসঙ্গত, গত ২৫ জুন মেজিয়ার শ্যামাপুরে আত্মঘাতী হয়েছিলেন সমর গড়াই। তৃণমূলের হুমকি ও চাপে মেজিয়ার শ্যাম স্টিল কারখানার শ্রমিক সমর গড়াইকে প্রায় তিন বছর আগে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিয়েছিলেন ঠিকাদার। তারপর তিনি অনেক চেষ্টা করেছেন অভাবের সঙ্গে লড়তে। অনটন সহ্য করতে না পেরে একসময়ে তাঁর বাড়ির কাছে গাছে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। গত ১৮ জুন ভিন রাজ্যে কাজ হারিয়ে গ্রামে ফেরা শঙ্কর রায় আত্মঘাতী হয়েছিলেন ধূপগুড়িতে।

গত ১৬ জুন বেহালায় আত্মঘাতী হন ভাস্কর রায় (৩৮)। তিনি লকডাউনে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকরি হারিয়ে বাধ্য হয়েছিলেন প্লাস্টিকের ব্যাগ বিক্রির কাজে নামতে। কিন্তু তাতেও অভাব কমাতে পারেননি। গত ১১ জুন কীটনাশক খেয়ে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট ব্লকের নাজিরপুর পঞ্চায়েতের দাসুল গ্রামের ননীগোপাল বর্মণ (৬৫) নামে এক গ্রামীণ শ্রমজীবী আত্মহত্যা করেন।

গত ৬ জুন বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন পরিযায়ী শ্রমিক, কুশমণ্ডি থানার গোপালপুর গ্রামের প্রসেনজিৎ মার্ডি (২৫)। গত ২ জুন কলকাতার রফি আহমেদ কিদোয়াই রোডের ফুটপাথে গায়ে কেরোসিন তেল ঢেলে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন শাহরুখ খান নামে এক যুবক। তিনিও অনেক চেষ্টা করেও কাজ জোগাড় করতে পারছিলেন না।