Saturday, October 16, 2021
Homeজেলাপশ্চিম মেদিনীপুরচিকিৎসা নেই, স্নাতক আদিবাসী যুবক বেড়ি পরে ঘরেই! উঠছে প্রশ্ন?

চিকিৎসা নেই, স্নাতক আদিবাসী যুবক বেড়ি পরে ঘরেই! উঠছে প্রশ্ন?

- Advertisement -

খড়গপুর ২৪×৭ ডিজিটাল: মানসিক রোগগ্রস্ত হয়ে দুপায়ে লোহার শক্ত বেড়ি পরে প্রায় দেড়বছর সম্পূর্ণ চিকিৎসাহীন অবস্থায় ৬ফুট বাই ৪ফুটের শতচ্ছিন্ন একটি ঝুপড়ি ঘরে এক স্নাতক আদিবাসী যুবক প্রশান্ত মাণ্ডির জীবন তিলে তিলে শেষ হতে বসেছে।

এই ভয়াবহ মর্মস্পর্শী চিত্র উঠে এসেছে জঙ্গলমহল সিমলাপালের বিক্রমপুর অঞ্চলের আদিবাসী নিবিড় শালবনী গ্রামে।

- Advertisement -

সিমলাপালের কয়েকজন যুবকের উদ্যোগে তৈরি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘‘আমরা পাশে আছি’’র সদস্যরা এই মর্মান্তিক ঘটনা প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছেন। কারণ ২৬বছরের এই প্রশান্ত মাণ্ডি তাঁদের সঙ্গেই সিমলাপাল মদনমোহন হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছেন। পরে তিনি কলেজ থেকে স্নাতকও হন। পাঁচ বছর আগে কোনও এক জায়গায় একটি কাজও সংগ্রহ করেন।

কিন্তু কাজে যোগ দেওয়ার আগেই মানসিক অবসাদ নেমে আসে তাঁর। নিয়োগপত্রও ছিঁড়ে ফেলেন। কোথায় কী কাজ পেয়েছিলেন তাঁর মা, দাদা কেউই বলতে পারছেন না। আর প্রশান্ত তো কথা বলার অবস্থাতেই নেই। কেউ ডাকলে তিনি খালি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। শুক্রবার ‘‘আমরা পাশে আছি’’ সংগঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা সঞ্জীবন সিংহ মহাপাত্র জানান, দু’দিন আগেই আমরা প্রশান্তর এই করুণ পরিণতির খবর পাই। যন্ত্রণা শুরু হয় আমাদের। প্রশান্ত অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিল।

দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে নিজেকে তৈরি করেছিল। তাঁর এই করুণ পরিণতি আমরা মেনে নিতে পারছি না। এই খবর পাওয়ার পরই সঞ্জীবন, কৌশিক দাস, অচিন্ত্য সিংহবাবু, আর্য রক্ষিতরা শালবনী গ্রামে যান। এঁরা জানান, বন্ধু প্রশান্ত আমাদের চিনতে পারেনি। স্থবির হয়ে গেছে সে। আমরা চেষ্টা করব তাঁর জন্য কিছু করার।

সিমলাপাল নদীঘাট থেকে বিক্রমপুর যাওয়ার পথে এক কিলোমিটার পেরিয়ে বাঁ দিক ধরে আরও এক কিলোমিটার যাওয়ার পর এই শালবনী গ্রাম পড়বে। পুরো গ্রামেই সাঁওতাল আদিবাসী জনগোষ্টীর বাস। ৩২টি পরিবার এখানে বাস করেন। সকলেই গরিব জনমজুর। শান্তশিষ্ট এই গ্রামের মানুষজনের কাছে প্রশান্ত ছিল একটা উদাহরণ। তাঁর এই অবস্থা গ্রামের মানুষও মেনে নিতে পারছেন না। এদিন ঘরে গিয়ে দেখা গেল পুরো ঘর ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। চালা নেই বললেই চলে। উপরে একটা পাতলা ছেঁড়া ত্রিপল মেলা আছে।

ঘরের সাইজ ৬ফুট লম্বা, ৪ফুট চওড়া। যেরকম ঝুপড়িতে ছাগল থাকে সেরকম ঘরে মা ভারতী এ প্রশান্ত থাকেন। দাদা প্রদীপ আনন্দপুর গ্রামে একটি মাইকের দোকানে কাজ করেন। এখন করোনা পরিস্থিতিতে তাঁরও কাজ নেই। দাদা প্রদীপ ঘরে থাকতে পারেন না। এই ঝুপড়িতে একজনের থাকাই মুশকিল সেখানে প্রশান্ত ও মা থাকায় প্রদীপ পাশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাত কাটান।

বিধবা মা ভারতী মাণ্ডি কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, প্রশান্তর চিকিৎসার জন্য তাঁদের যেটুকু জমি ছিল তার সবটাই বন্ধক দেওয়া হয়েছে। বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজ থেকে শুরু করে নানা জায়গায় তাঁর চিকিৎসার জন্য গিয়েছি। কাজ কিছু হয়নি। এখন হাতে একটি টাকাও নেই। তাই আজ দেড় বছর ধরে প্রশান্তর কোনও চিকিৎসা হয়নি। মা ভারতী জানান, ‘বাড়ির যা অবস্থা তাতে যে কোনোদিন বাড়ি চাপা পড়ে মারা যাব’।

আজও পর্যন্ত বিধবা ভাতা পেলেন না তিনি। পঞ্চায়েতের কাছে বারে বারে বাড়ির জন্য ছুটেছেন, পঞ্চায়েতের লোকজন জানেন কোনও অবস্থায় মানসিক রোগী ছেলেকে নিয়ে তিনি দিন কাটাচ্ছেন। এসব জেনেও কেউ এগিয়ে আসেনি। তাঁরও কোনও কাজ নেই।

রেশনের যে চালটুকু পান তাই ফুটিয়ে খান। এতে তো আর শরীর টেকে না। ডাক্তারবাবুরা বলেছিলেন প্রশান্তর ভালো হওয়ার জন্য একটু ভালোমন্দ খাবার দরকার। ‘কোথায় পাব খাবার? আমরা তিনজনেই আজ বেকার।

জমি ছাড়াতে পারিনি।’ প্রশান্তর পায়ে বেড়ি পরানোর কারণ হিসাবে মা জানান, আমি কাজের খোঁজে বেরিয়ে পড়ি। ছেলে একা থাকে। যদি কোথাও পালিয়ে যায় তার জন্য এই বেড়ি পরিয়ে রেখেছি। চোখের সামনে ছেলের এই যন্ত্রণা আর সইতে পারছি না। যদি এর একটু চিকিৎসা হয় তাহলে হয়তো ভাল হয়ে উঠবে। কিন্তু কে দেখবে আমাদের? কোথায় পাব টাকা? এই ঝুপড়ি ঘরে মা, বেটার পুরো শরীর মেলা যায় না।

সরকার তো বাড়ি দিচ্ছে, আমরা একটা বাড়ি পাব না? মা জানান, প্রশান্ত হয়তো সবটা বুঝতে পারে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। হয়তো আমরা এভাবেই তিনজন একদিন মরে পড়ে থাকব, কাকপক্ষীও জানতে পারবে না।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

error: Content is protected !!