Sunday, September 19, 2021
Homeজেলাপশ্চিম মেদিনীপুরExclusive: মা-বাবাকে হারিয়ে অসহায় খড়গপুরের দুই বোন

Exclusive: মা-বাবাকে হারিয়ে অসহায় খড়গপুরের দুই বোন

- Advertisement -

খড়গপুর ২৪×৭ ডিজিটাল: বাবা নেই। মারা গিয়েছেন সেই একেবারে ছোটোবেলায়।  আর মায়ের মৃত্যু হয়েছে সম্প্রতি। গত ২৩ এপ্রিল মা এস উমার মৃত্যু হয়েছে কোভিড আক্রান্ত হয়ে। এখন মা ও বাবাকে হারিয়ে একেবারে অনাথ হয়ে গিয়েছে  বছর সতেরোর এস গৌতমী ও বছর পনেরোর এস দেবী।

এঁরা দুই বোন। বাড়ি খড়গপুর পুরসভার আঠারো নম্বর ওয়ার্ডের নিউ সেটেলমেন্ট এলাকায়। রেল কোয়ার্টারে বসবাস। বাবা এস নারায়ণ রাওয়ের যখন মৃত্যু হয় তখন এই দুজনেই খুব ছোটো ছিল। ২০০৮ সালে রোগে আক্রান্ত হয়ে বাবার মৃত্যু হয়।  গৌতমী তখন বছর চারেকের। আর দেবী তো একেবারেই দুধের শিশু ছিল।

- Advertisement -

মাত্র এক বছর বয়স তখন। আর এত ছোটোবেলায় বাবাকে হারানোর কারনে তাঁকে অত মনে নেই। কিন্তু মাকে কিছুতেই ভুলতে পারছে না অসহায় অভিভাবকহীন এই দুই কন্যা। যদিও এক মামাতো দাদা কে সুমন কিছুটা দেখভাল করেন। আর এক মামাতো দিদি রোজা মাঝেমধ্যে জামশেদপুর থেকে আসেন। খোঁজ খবর রাখেন। কিন্তু মায়ের অভাব তো আর এঁরা পূরণ করতে পারেন না।

ফলে মায়ের কথাই সারাক্ষণ মনে পড়ে। কারন জ্ঞান হওয়ার পর থেকে এই দুই বোনের মা ছিলেন জীবনের সবকিছু। যা কিছু আব্দার মায়ের কাছে ছিল। মাই ছিলেন জীবনের সবকিছু। মায়ের উপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে পরম নিশ্চিন্তে দিনগুলি কাটিয়েছে। মা উমাদেবী রেল কর্মী ছিলেন। ফলে আর্থিক কিংবা সামাজিক কোনও অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয় নি। মা একা হাতে সবকিছু সামলে নিতেন।

কিন্তু সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে গত ২৩ এপ্রিলের পর থেকে। সেইদিন দুপুরে  খড়গপুর রেলওয়ে মেইন হাসপাতালে কোভিড আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪২ বছর বয়সে উমাদেবীর মৃত্যু হয়। দুপুর দেড়টার সময় মায়ের মৃত্যুর খবর আসার পরই যেন গোটা পৃথিবী শূন্য হয়ে গিয়েছিল বড় দিদি গৌতমীর। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গিয়েছিল। এক লহমায় সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল। ভেবে উঠতে পারছিল না কি করবে।

কি করা উচিত। কারন মাকে তো আর কাছে পাবে না। এমনকি শেষ দেখাটাও দেখতে পারবে কিনা সেই নিয়ে সংশয় ছিল। তবে হ্যাঁ। পরের দিন মাকে শেষ দেখা দেখতে পেয়েছিল এই দুই বোন। রাত নটার সময় খড়গপুর শহরের খরিদা মন্দিরতলা শ্মশানঘাটে। তাও দূর থেকে শুধুমাত্র মায়ের মুখটাই দেখতে পেয়েছিল। সেই শেষ দেখা। তারপর থেকে ১৪ দিন বাড়িতে কোয়ারাইন্টাইনে থাকতে হয়েছে।

সবচেয়ে কষ্টের সময় ছিল সেটা। একদিকে মায়ের মৃত্যুর শোক। অপরদিকে আত্মীয় স্বজন থেকে দূরে থাকা। তারপর যাও বা কোয়ারাইন্টাইন পর্ব শেষ হয়েছে। কিন্তু ক্রমশ ঘিরে ধরেছে একাকিত্ব। তারসাথে ছোটো বোনকে দেখভাল করার দায়িত্বভার। এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে এখন থেকেই এই বয়সেই যেন পরিণত হয়ে ওঠার আপ্রাণ লড়াই শুরু হয়েছে।

এই মাস চারেক আগেও নাস্তা থেকে শুরু করে রাতের খাবার নিয়ে কোনও চিন্তা করতে হতো না। কারন মা ছিলেন যে। মাই সবকিছু করতেন। কিন্তু এখন এই পুরো দায়িত্বটা পালন করতে হচ্ছে খড়গপুর শহরের নিউ সেটেলমেন্ট এলাকার অন্ধ্র হাই স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়া এই গৌতমীকে। বোন দেবী এই স্কুলে নবম শ্রেণীর ছাত্রী। তারসাথে রয়েছে আর্থিক অনিশ্চয়তার ভবিষ্যত।

মায়ের মৃত্যুর পর রেল থেকে ২৫ হাজার টাকা পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু এই টাকাও প্রায় শেষের দিকে। ফলে আগামী দিনগুলি কিভাবে কাটবে সেই দুশ্চিন্তা সতেরো বছরের এই নাবালিকাকে ক্রমশ ঘিরে ধরছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে তার এখন একটাই চিন্তা ছোটো বোনটাকে ঠিকঠাক করে রাখা। মায়ের কথা উঠতেই কেঁদে ভাসালো দুই বোন। মায়ের একটি ছবি শোয়ার ঘরে বাঁধিয়ে রেখেছে।

রোজ একটি করে মালা দেয়। ধূপ জ্বালায়। রীতিমতো চোখের জল ফেলতে ফেলতে গৌতমী বলল ” মায়ের কথা সবসময় মনে পড়ে। বিশেষ করে রাতে শুতে যাওয়ার সময়। আর সকালে ঘুম থেকে উঠার পর।” তাঁর কাছ থেকে জানা গেল আজ পর্যন্ত অনাথ হয়ে যাওয়া এই দুটি মেয়ের খোঁজ খবর নিতে একমাত্র ওয়ার্ড কাউন্সিলর এ পূজা নায়ডু দুবার এসেছিলেন। এছাড়া আজ পর্যন্ত আর কোনও নেতা কিংবা বিধায়ক বা সাংসদ বা সরকারের পক্ষ থেকে কেউ খোঁজখবর নিতে আসেননি।

এই ব্যাপারে খড়গপুর পুরসভার প্রশাসক তথা প্রাক্তন বিধায়ক প্রদীপ সরকার বলেছেন ” আমি বিষয়টি জানি না। আপনার কাছ থেকে প্রথম জানলাম। খোঁজ খবর নিয়ে দেখি। কিছু করা যায় কিনা। কারন পুরসভার পক্ষ থেকে তো স্থায়ীভাবে কিছু করার সুযোগ নেই। তারমধ্যেও কিছু করা যায় কিনা দেখব।”

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

error: Content is protected !!